জলপাইগুড়িতে রণক্ষেত্র স্কুল, শিক্ষক দিবসে ছাত্রদের মারে রক্তাক্ত প্রধান শিক্ষক
সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল রণক্ষেত্রে। বিশেষ খাওয়াদাওয়া থেকে বাদ পড়া এবং মিড-ডে মিলের অনিয়মকে কেন্দ্র করে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটল উত্তরবঙ্গের শতবর্ষ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে। ক্ষুব্ধ ছাত্রদের হাতে আক্রান্ত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ধর্মচাঁদ বারুই। শুধু তা-ই নয়, আহত প্রধান শিক্ষককে উদ্ধার করতে আসা পুলিশের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখায় ক্ষুব্ধ ছাত্ররা। অভূতপূর্ব এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র জলপাইগুড়ি শহরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা স্কুলে এক বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু অভিযোগ, এই নৈশভোজ বা বিশেষ খাবারের আয়োজন থেকে বাদ দেওয়া হয় দশম শ্রেণির ছাত্রদের। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রথম থেকেই ছাত্রদের মনে অসন্তোষ ছিল।এর পাশাপাশি বেশ কিছুদিন ধরেই প্রতিদিনের মিড-ডে মিলের খাবারে অনিয়ম এবং অপর্যাপ্ত পরিমাণ নিয়েও ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জমা হয়েছিল। শিক্ষক দিবসের বিশেষ দিনে সেই অসন্তোষই আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। ঘটনার দিন সকালে ছাত্ররা বৈষম্যের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রথমে প্রধান শিক্ষক ধর্মচাঁদ বারুইয়ের ঘরের সামনে জড়ো হয়ে সোচ্চার হয়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রধান শিক্ষককে ঘিরে ধরে শুরু হয় বিক্ষোভ ও ধাক্কাধাক্কি। অভিযোগ, উত্তেজনার পারদ এতটাই চড়ে যায় যে একপর্যায়ে কয়েকজন ছাত্র সরাসরি প্রধান শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়। এলোপাতাড়ি মারধরে তিনি মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত পান এবং রক্তাক্ত অবস্থায় চত্বরেই লুটিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রধান শিক্ষককে মারতে মারতে কার্যত ঘাড়ধাক্কা দিয়ে স্কুল ভবনের বাইরে বের করে দেওয়া হয়। প্রাচীন এই বিদ্যালয়ে এমন অনভিপ্রেত ও মারমুখী পরিবেশ এর আগে কখনও দেখা যায়নি। স্কুল চত্বরে এই চরম বিশৃঙ্খলা ও প্রধান শিক্ষকের রক্তাক্ত হওয়ার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় স্থানীয় থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। কিন্তু উন্মত্ত ছাত্রদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় পুলিশকেও। আঘাতপ্রাপ্ত ও রক্তাক্ত প্রধান শিক্ষক ধর্মচাঁদ বারুইকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে পুলিশের গাড়ি ঘিরে ধরে পথ আটকে দেয় ছাত্ররা। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে বচসা ও টানাপোড়েন। অবশেষে পুলিশের চরম তৎপরতায় এবং অন্যান্য শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে আহত প্রধান শিক্ষককে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা স্কুলের সামনে এসে ভিড় জমান। শিক্ষক দিবসের মতো একটা দিনে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে এহেন হিংসাত্মক সংঘর্ষ জলপাইগুড়ির সুশীল সমাজকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বর্তমানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও জেলা শিক্ষা দপ্তর যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
