৬৪ খোপে নতুন বিস্ময় ! মাত্র ১৫ বছরেই কার্লসেনকে মাত করলেন ভারতের বন্দন
নয়াদিল্লি : অনলাইন চেস বোর্ডে তৈরি হলো ইতিহাস!
বিশ্ব দাবা মানচিত্রে ফের এক নতুন তারকার উদয় দেখল ক্রীড়াবিশ্ব। বিশ্ব দাবার এক নম্বর তারকা তথা কিংবদন্তি ম্যাগনাস কার্লসেনকে মাত্র ৫০ চালে হারিয়ে ক্রিকেট-পাগল এই দেশে দাবা নিয়ে আলোড়ন তৈরি করলেন ভারতের ১৫ বছর বয়সী কিশোর বন্দন আলঙ্কার সওয়াই। চেস ডট কমের (Chess.com) প্রতি সপ্তাহের জনপ্রিয় ‘টাইটেল্ড টিউসডে’ টুর্নামেন্টে এই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন দিল্লির সরদার প্যাটেল বিদ্যালয়ের এই ছাত্র।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, বিশ্বের এক নম্বর তথা সর্বকালের অন্যতম সেরা দাবাড়ুকে পরাজিত করার পরও তরুণ এই দাবাড়ুর মধ্যে বিন্দুমাত্র বাড়তি উত্তেজনা দেখা যায়নি! খেলা শেষে বাবা-মাকে জয়ের খবর জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেননি তিনি। পরদিন সকালে তার বাবা নিজেই ওয়েবসাইট লগ-ইন করে দেখতে পান, ছেলে কার্লসেনকে মাত করেছে!
বন্দনের মা ডক্টর মাধুরী আলঙ্কার সওয়াই সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “স্বামী যখন নিজে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তখন ও খুব শান্তভাবে জানাল যে ও কার্লসেনের বিরুদ্ধে খেলে জিতেছে। সত্যি বলতে, ও এই টুর্নামেন্টে অংশই নিতে চাইছিল না, আমরাই এক প্রকার জোড়াজুরি করে ওকে খেলায় বসিয়েছিলাম।” বন্দনের কোচ গুরপ্রীত পাল সিংও জানান, তিনি পরের দিন বন্দনের বাবার থেকেই এই ঐতিহাসিক জয়ের খবরটি পান। ছেলেটি একটু লাজুক ও রিজার্ভড স্বভাবের।
যে ভাবে হারলেন কার্লসেন
মাত্র ২২৮৮ এলো (ELO) রেটিং নিয়ে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডে বিশ্বের এক নম্বর তারকা ম্যাগনাস কার্লসেনের (রেটিং ২৮২৩) মুখোমুখি হয়েছিলেন সাদা ঘুঁটি নিয়ে খেলা বন্দন। বিশ্বসেরাকে হারানোর পথ কেমন ছিল? তরুণ বন্দনের সহজ জবাব, “আমার হারানোর কিছু ছিল না, জেতার জন্য পুরো আকাশ খোলা ছিল। আমি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ‘e4’ চাল দিয়ে খেলা শুরু করি।”
কার্লসেন ‘e5’ দিয়ে জবাব দিলে ম্যাচটি বিখ্যাত ‘জিউকো পিয়ানো’ (Giuoco Piano) ভ্যারিয়েশনে গড়ায়। ম্যাচের ২৬ নম্বর চাল পর্যন্ত দুই দাবাড়ুর লড়াই সমানে-সমানে চলছিল। কিন্তু ২৬ নম্বর চালেই ঘটে ছন্দপতন। বন্দনের সাদা বিশপ (Bishop) দিয়ে আক্রমণ করার সময় এক বিরাট ভুল (‘ব্লান্ডার’) করে বসেন খোদ প্রাক্তন বিশ্বসেরা কার্লসেন। বিশপটিকে কাটার পরিবর্তে নিজের রাজাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বড় ভুল করেন তিনি, যার ফলে চালের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হারিয়ে ফেলেন নরওয়েজিয়ান এই মহাতারকা।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বন্দন বলেন, “কার্লসেন যখন ওই ভুলটা করলেন, আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম! বিশ্বসেরা খেলোয়াড় যে এমন ভুল করতে পারেন, তা বিশ্বাসই হচ্ছিল না।” এরপর আর কোনো সুযোগ না দিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ৫০তম চালে ম্যাচ পকেটে পুরে নেন বন্দন।
সামনের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
কার্লসেনকে হারানোর পর অত্যন্ত ক্লান্ত বোধ করায় টুর্নামেন্টের চতুর্থ রাউন্ডের পরেই নাম প্রত্যাহার করে নেন বন্দন। চার রাউন্ডের মধ্যে তিনটিতেই জয় পান তিনি। পরদিন স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের এই জয়ের কথা বললে অনেকেই তা বিশ্বাস করতে চাননি!
শ্রেণিকক্ষের ফার্স্ট বয় বন্দন ঐতিহাসিক যুদ্ধের বই পড়তে ভালবাসেন, তবে সিনেমা বা ফিকশনে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য খুব দ্রুত ‘ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার’ (IM) খেতাব অর্জন করা। তবে দাবাকেই পেশা করবেন কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত নন তিনি। বন্দন বলেন, “আমার বয়সে অনেকেই তো গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে গেছে। আমি ভবিষ্যতে ইতিহাস বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার কথা ভাবছি।”
বন্দনের এই অপ্রত্যাশিত জয় এখন ভারতীয় ক্রীড়ামহলে চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। এক চালের ভুলেই হোক কিংবা বন্দনের দুর্দান্ত মানসিক প্রস্তুতি, ১৫ বছরের এই কিশোর যে বিশ্ব দাবার সবচেয়ে বড় নামটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে— তা নিঃসন্দেহে ভারতীয় ক্রীড়াজগতের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত।
