লোকসভার জোড়া চাপে কোণঠাসা তৃণমূলের ২০ বিদ্রোহী সাংসদ
বিশেষ সংবাদদাতা: ত্রিপুরা-ভিত্তিক প্রায় অজানা দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র সঙ্গে হাত মিলিয়েও স্বস্তি মিলল না। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদের ঘাড়ে নামল পদ খারিজের খাঁড়া। প্রথমত, লোকসভা সচিবালয়ের দেওয়া কড়া নোটিস; দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের সক্রিয় অবস্থান— এই জোড়া ফলায় এক লহমায় ব্যাপক রাজনৈতিক চাপে পড়ে গেলেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবির।
সচিবালয়ের কড়া সমন: সময় মাত্র ৭ দিন
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) লোকসভা সচিবালয়ের পক্ষ থেকে বিক্ষুব্ধ ২০ জন সাংসদের কাছে আনুষ্ঠানিক নোটিস পাঠানো হয়েছে। তাতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা লোকসভায় দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা দলত্যাগ-বিরোধী পিটিশনের উত্তর দিতে হবে আগামী সাত দিনের মধ্যে।
‘মেম্বার্স অব লোকসভা (ডিসকোয়ালিফিকেশন অন গ্রাউন্ড অব ডিফেকশন) রুলস, ১৯৮৫’-র ৬ নম্বর নিয়ম উল্লেখ করে এই নোটিস জারি করা হয়েছে। লোকসভা সচিবালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, “মাননীয় স্পিকারের বিবেচনার জন্য আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই আবেদনের ভিত্তিতে আপনাদের বক্তব্য পেশ করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।” এই ৭ দিনের সময়সীমা শেষ হলেই স্পিকার ওম বিড়লা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
সুপ্রিম কোর্টে মামলা: আইনি মেয়াদে চরম অস্বস্তি
ঘটনাচক্রে, যে দিন লোকসভা সচিবালয় নোটিস জারি করল, সে দিনই শীর্ষ আদালতে বড় ধাক্কা খেয়েছেন বিদ্রোহীরা। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনিয়ার সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত শুনানির আর্জি গ্রহণ করেছেন। এই বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতও বিদ্রোহী সাংসদদের অবস্থান জানতে চেয়ে জবাব তলব করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদীয় নিয়ম ও সর্বোচ্চ আদালতের নজরদারি— এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে এখন রীতিমতো কোণঠাসা ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ। ফলে জলঘোলা করে বাড়তি সময় বের করার সুযোগ তাঁদের হাত থেকে প্রায় ফুরিয়ে এল।
অভিষেকের ধারাবাহিক আইনি লড়াই
গত জুন মাসে এই ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে হঠাৎই ত্রিপুরাভিত্তিক দল NCPI-তে যোগ দিয়ে পৃথক দল গঠনের দাবি জানান। কিন্তু তার পরেই ১৮ জুন এই ২০ জন সাংসদের পদ খারিজের দাবিতে পৃথক পৃথক আবেদন জানান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুধু আবেদন জমা দিয়েই খান্ত থাকেননি তৃণমূলের ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। ২৭ জুলাই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পিকারকে লিখিত চিঠি পাঠান তিনি। এর পর ১২ আগস্ট স্বয়ং স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সংসদ ভবনে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করে দ্রুত নিষ্পত্তির আর্জি জানান। সেই ধারাবাহিক চেষ্টার পর লোকসভা সচিবালয়ের এই পদক্ষেপ তৃণমূলের সরকারি শিবিরের বড় সাফল্য বলেই ধরা হচ্ছে।
যে ২০ জন সাংসদের ভাগ্য ঝুলছে সুতোয়
লোকসভার দেওয়া পদ খারিজের এই নোটিসের তালিকায় তৃণমূলের প্রথম সারির একাধিক পরিচিত মুখ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
কাকলি ঘোষ দস্তিদার
-
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
-
শতাব্দী রায়
-
প্রসুন বন্দ্যোপাধ্যায়
-
রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়
-
জগদীশ চন্দ্র বর্মা বসুনিয়া
-
পার্থ ভৌমিক
-
অরূপ চক্রবর্তী
-
অধিকারী দীপক দেব (দেব)
-
সায়নী ঘোষ
-
বাপি হালদার
-
মহম্মদ আবু তাহের খান
-
কালীপদ সোরেন খেরওয়াল
-
অসিত কুমার মাল
-
জুন মালিয়া
-
মিতালী বাগ
-
খলিলুর রহমান
-
মালা রায়
-
শর্মিলা সরকার
-
ইউসুফ পাঠান
কোণঠাসা অবস্থানে শেষ রক্ষা কোথায়?
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে পৃথক অস্তিত্ব জাহির করতে গিয়ে এখন সংসদীয় পদ হারানোর মুখে এই হেভিওয়েট নেতারা। আগামী সাত দিনের মধ্যে লোকসভা সচিবালয়ে তাঁদের পেশ করা যুক্তির ওপর নির্ভর করছে সংসদীয় কেরিয়ার। সুপ্রিম কোর্টও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেওয়ায় আইনি পথ পার হওয়া বিদ্রোহী সাংসদদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াল। লোকসভার এই কড়া অবস্থান তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরকে যে একেবারে ব্যাকফুটে ঠেলে দিল, তা নিয়ে সংশয় নেই রাজনীতির ময়দানে।
