বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার এবার রাজ্য়ের মডেল স্কুল প্রকল্পে সিএম শ্রী ইন্সটিউট, ঘোষণা মুখ্য়মন্ত্রীর

মালদহ মেডিকেলে একদিনে ১০ শিশুর মৃত্যু, রিপোর্ট তলব করল স্বাস্থ্য দপ্তর

26 August, 2026 6:36 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদন : মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নবজাতকদের মৃত্যুর এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি অগস্ট মাসে তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এই হাসপাতালে মোট ৬০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কোনও একটি দিনেই ১০টি নবজাতকের প্রাণহানি ঘটে। ঘটনাটি সামনে আসার পর জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতর তৎপর হয়ে উঠেছে।

মালদহ মেডিক্যাল কলেজের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে অভিযান শুরু করেছে স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা।হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি মূলত অগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের। মালদহ মেডিক্যাল কলেজে প্রসূতি মা ও নবজাতকদের জন্য আলাদা একটি ভবন রয়েছে।

তৃণমূল জমানায় এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘মাতৃমা’। ১ হাজার ১২০টি বেডের এই ভবনেই মূলত ঘটনাগুলি ঘটেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, যে ১০টি শিশুর মৃত্যু একদিনে হয়েছে, তাদের মধ্যে আটটি শিশুকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলার অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে এই মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হয়েছিল। ওই দিনেই মালদহ মেডিক্যাল কলেজে জন্ম নেওয়া দুটি শিশুও মারা যায়।

মালদহ মেডিক্যাল কলেজের সুপার প্রসেনজিৎ বর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, “১০টি শিশুর মধ্যে মাত্র দু’জন শিশুর জন্ম হয়েছিল মালদহ মেডিক্যাল কলেজে। বাকিদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাইরে থেকে এখানে রেফার করা হয়েছিল।” তিনি জানান, স্বাস্থ্যভবন থেকে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টও দ্রুত পাঠানো হবে।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত শিশুদের মধ্যে কারও শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল, কেউ ভুগছিলেন জন্ডিসে, আবার কারও হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা ছিল।

ডেথ সার্টিফিকেটে এসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই দিনে ১০টি এবং তিন সপ্তাহে ৬০টি শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত শুরু হয়েছে।প্রথমে এই ঘটনাটি সামনে আনতে চায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে স্বাস্থ্য দফতরের সাইটে মৃত্যুর তথ্য আপলোড হলে বিষয়টি নজরে আসে। এরপরই শোরগোল পড়ে যায়।

স্বাস্থ্যভবন থেকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জেলাশাসকের দপ্তরে এ নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। এক আধিকারিকের কথায়, “একটি জেলায় একটি সপ্তাহে শিশুমৃত্যুর হার গোটা রাজ্যের শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করেছে। সারা দেশের প্রেক্ষিতেও এই ঘটনা উদ্বেগজনক।”উল্লেখ্য, অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও দু’দিনে ১০টি শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

মালদহের ঘটনার পর জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবজাতকদের মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অপরিণত জন্ম, কম ওজন, সংক্রমণ, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, জন্ডিস বা হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা—এসবই সাধারণ কারণ।

তবে একসঙ্গে এত সংখ্যক মৃত্যু হলে হাসপাতালের পরিকাঠামো, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, রেফারেল সিস্টেম এবং পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মালদহ মেডিক্যাল কলেজের ‘মাতৃমা’ ভবনে পর্যাপ্ত বেড থাকলেও গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের (নিকু) পর্যাপ্ততা ও মান নিয়েও পর্যালোচনা চলছে।জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে অনেক শিশুকেই অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় অন্যান্য হাসপাতাল থেকে পাঠানো হয়েছিল।

রেফারেল ব্যবস্থায় দেরি বা যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়াও একটি বড় কারণ হতে পারে। এ ছাড়া নার্সিংহোমগুলিতে প্রসবের সময় যথাযথ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। অভিযানের সময় কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের আঁচ পাওয়া গেছে বলেও জানা গেছে।স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে।

কোন তারিখে কত শিশু মারা গেছে, তাদের জন্মের স্থান, রেফারেলের সময়, চিকিৎসার বিবরণ এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ—সবকিছুর পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট পাঠানো হলেও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দ্রুত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।এই ঘটনা শুধু মালদহের নয়, পুরো রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরছে।

শিশুমৃত্যুর হার কমানোর জন্য সরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে এখনও অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা থেকে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের সময়মতো উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানো, রেফারেল ব্যবস্থার দক্ষতা এবং হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স ও যন্ত্রপাতির অভাব—এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েও এভাবে শিশু হারাতে হচ্ছে।

নার্সিংহোম ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও অনেক সময় অবহেলা দেখা যায়। প্রশাসনের অভিযান যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে দাবি তাদের।মালদহ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা সব ধরনের সহযোগিতা করছে। তদন্তের ফল বেরিয়ে এলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ইতিমধ্যে নবজাতকদের চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিকু ওয়ার্ডে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। নবজাতকদের মৃত্যু রোধে প্রসবপূর্ব ও প্রসবপরবর্তী যত্নের মান বাড়াতে হবে। মায়েদের পুষ্টি, নিয়মিত চেকআপ, নিরাপদ প্রসব এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হবে।মালদহের এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক বড় দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। তদন্তের ফল কী বেরিয়ে আসে এবং কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন সবার নজর। একদিনে ১০টি এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহে ৬০টি নবজাতকের মৃত্যু—এই পরিসংখ্যান যেন কেবল সংখ্যা নয়, এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee