বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

কুমোরটুলির ব্যস্ততাকে ছাপিয়ে চলছে সেলফি, প্রি ওয়েডিং শ্যুট

01 October, 2026 4:00 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

লোপামুদ্রা ভৌমিক * কলকাতা

কুমোরটুলির গলিতে এখন আর দিনরাতের খুব একটা তফাত নেই। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেও প্রতিটি স্টুডিওয় আলো জ্বলতে থাকে অনেক রাত পর্যন্ত। কোথাও টিমটিম করে জ্বলছে বাল্ব, কোথাও ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে দেবী। মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে রং, বার্নিশ আর খড়ের গন্ধ। শিল্পীর হাত চলছে অবিরাম। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটু একটু করে সম্পূর্ণ হয়ে উঠছে মাতৃপ্রতিমা।

কয়েক দিন বৃষ্টির ভ্রুকুটি ছিল। ভিজে আবহাওয়ায় মাটি শুকোনো, রং করা— সবেতেই বাড়তি ঝক্কি। কিন্তু আকাশ একটু পরিষ্কার হতেই যেন গতি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি এলেও শিল্পীদের আর দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এখন কুমোরটুলির অলিগলিতে দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। প্রতিমা বেরোচ্ছে একের পর এক। কেউ ট্রাকে, কেউ ছোট গাড়িতে, কেউ আবার সাবধানে বাঁশের কাঠামোয় বেঁধে রওনা দিচ্ছেন গন্তব্যের দিকে।


কোনও প্রতিমার ঠিকানা কলকাতার কোনও বনেদি বাড়ি, কোনওটি যাবে পাড়ার বড় পুজোমণ্ডপে। আবার কোনও দেবী পাড়ি দেবেন দেশের অন্য শহরে। কেউ কেউ তো যাবেন সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশের মণ্ডপে। কুমোরটুলির মাটি তাই এ সময়ে শুধু কলকাতার গলি চেনে না, তার গন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে।

আর সেই কারণেই শিল্পীদের এখন রাতজাগা পর্ব। কোথাও শেষ মুহূর্তে মুকুট বসছে, কোথাও শাড়ির ভাঁজ ঠিক করা হচ্ছে, কোথাও দেবীর হাতের অস্ত্র সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনও কর্মশালায় শিল্পী ঝুঁকে পড়েছেন প্রতিমার মুখের উপর। তুলির এক-দুই আঁচড়ে বদলে যাচ্ছে মুখের অভিব্যক্তি। প্রদীপের আলো ধরে আঁকছেন চোখ। সেই মুহূর্তে যেন মাটির অবয়বের মধ্যে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবীর মহিমা।
কিন্তু কুমোরটুলির গল্প এখন শুধু শিল্পীর হাত আর প্রতিমার মধ্যেই আটকে নেই। গলির এক পাশে দাঁড়িয়ে কেউ মোবাইলের ক্যামেরায় তুলছেন দেবীর সঙ্গে সেলফি। একটু এগোলেই দেখা যাচ্ছে ক্যামেরা, ট্রাইপড আর আলো। চলছে প্রি-ওয়েডিং শ্যুট। মাটির প্রতিমার সারির মাঝখান দিয়ে হবু বর-কনে হাঁটছেন। ক্যামেরাম্যান কখনও নিচু হয়ে শট নিচ্ছেন, কখনও আবার কর্মশালার দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের।
কুমোরটুলি তাই এখন একই সঙ্গে শিল্পীর কর্মশালা, আলোকচিত্রীর লোকেশন, উৎসাহীদের সেলফি-জোন এবং পুজোর আগমনের এক জীবন্ত মঞ্চ। কখনও ক্যামেরার ক্লিক, কখনও কাঠামোয় হাতুড়ির টোকা, কখনও শিল্পীর ডাক, ‘ওই রংটা দাও তো’, কখনও আবার প্রতিমা গাড়িতে তোলার হুড়োহুড়ি। এই সব শব্দ মিলেমিশে তৈরি করছে পুজোর আগের কুমোরটুলির নিজস্ব সুর। আর এই সুরের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে কলকাতার পুজোর আসল প্রস্তুতি।


একসময় কুমোরটুলি মানেই ছিল মাটি, খড় আর প্রতিমা। এখন তার পরিধি অনেক বড়। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছবি, ফ্যাশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পর্যটন এবং শহুরে সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। তবু এত কিছুর মধ্যেও কুমোরটুলির প্রাণটা একই জায়গায়। শিল্পীর হাতের মুঠোয়। সেই হাতই খড়কে কাঠামো দেয়, কাঠামোকে মাটি দেয়, মাটিকে রং দেয়, আর শেষে চোখ আঁকে। তারপর একদিন সেই প্রতিমা বেরিয়ে যায় কুমোরটুলির গলি ছেড়ে। গাড়ির পিছনে পিছনে তাকিয়ে থাকেন শিল্পী। তাঁর তৈরি দেবী চলে যান মণ্ডপে, কখনও অন্য শহরে, কখনও অন্য দেশে। কুমোরটুলির গলিতে তখন আর একজন দেবীও নেই। পরের দেবীর কাজ শুরু হয়ে গেছে।

এইভাবেই পুজোর আগে রাত জাগে কুমোরটুলি। একের পর এক প্রতিমা বেরিয়ে যায়, আর একের পর এক নতুন গল্প তৈরি হয়। মাটি দিয়ে দেবী গড়ার পাড়া আজ তাই শুধু প্রতিমার ঠিকানা নয়। এ কলকাতার এক জীবন্ত স্টুডিও পাড়া। যেখানে শিল্প তৈরি হয়, ছবি তৈরি হয়, স্মৃতি তৈরি হয়। আর তার মাঝখানে নিঃশব্দে তৈরি হয় বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের মুখ।

প্রতিবেদন

UTSAB RC