Jemima Goldsmith: কারাগারে ইমরান, জেমিমার জীবনে নতুন বসন্ত
লন্ডন: একটা পুরনো গল্পের বইয়ের শেষ পাতায় যেন নতুন করে লেখা হল আর একটি অধ্যায়। ৫২ বছর বয়সে ফের বিয়ে করলেন জেমিমা গোল্ডস্মিথ। পাত্র আইরিশ-অস্ট্রেলীয় অর্থলগ্নিকারী ক্যামেরন ও’রেইলি। ঘনিষ্ঠ পরিজনদের উপস্থিতিতে সাদামাটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে নতুন সংসার শুরু করলেন তিনি। অথচ জেমিমার নাম উঠলেই আজও যে নামটা সবার আগে মনে পড়ে, তিনি ইমরান খান।

ইমরান একটা মোহের নাম
সময়টা ১৯৯৫। ক্রিকেটের মাঠে তখন ইমরান খান শুধু পাকিস্তানের নায়ক নন, উপমহাদেশের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ক্রিকেটারদের একজন। ১৯৯২-এর বিশ্বকাপ জয়ের পর তাঁর জনপ্রিয়তা যেন ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী, ইংল্যান্ডের অভিজাত সমাজে স্বচ্ছন্দ—ইমরানের ব্যক্তিত্বে তখন ক্রিকেটারের পাশাপাশি ছিল আন্তর্জাতিক তারকার ঔজ্জ্বল্য। কথিত রয়েছে পাকিস্তান ভারত সফরে আসলে সেই সময় ইমরানের হোটেলের সামনে নাকি বলিউডের তৎকালীন প্রথমসারির নায়িকারা হত্যে দিতেন।
ইমরানের জীবনে জেমিমা
খুব স্বাভাবিকভাবেই, সেই ইমরানের প্রেমে পড়েছিলেন সদ্য যৌবনে পা রাখা জেমিমা গোল্ডস্মিথ। তিনিও তখন কোনও সাধারণ পরিবারের তরুণী নন। তাঁর বাবা স্যার জেমস গোল্ডস্মিথ ছিলেন প্রভাবশালী অর্থলগ্নিকারী ও ব্যবসায়ী। মা লেডি অ্যানাবেল গোল্ডস্মিথ ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সন্তান, অষ্টম মার্কেস অব লন্ডনডেরির মেয়ে। লন্ডনের অর্মলি লজে বড় হওয়া জেমিমার শৈশবের চারপাশে ছিল ব্রিটিশ অভিজাত সমাজের এক আলাদা জগৎ। অর্থ, বংশপরিচয়, সামাজিক পরিচিতি—সবই ছিল তাঁর নাগালের মধ্যে।

ইমরান ও জেমিমা
নতুন জীবনে জেমিমা গোল্ডস্মিথ
কিন্তু প্রেম মানুষকে কখনও কখনও নিজের চেনা পৃথিবীর বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে ইমরানকে বিয়ে করে ব্রিটিশদের তথাকথিত নাকউঁচু আভিজাত্য বর্জন করে তরুণী জেমিমা চলে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে। লন্ডনের পরিচিত জীবন পিছনে রেখে শুরু হল একেবারে অন্য অধ্যায়। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি। ইসলাম গ্রহণ করলেন, উর্দু শেখার চেষ্টা করলেন, পাকিস্তানি পোশাকে অভ্যস্ত হলেন। ইমরানের সঙ্গে সংসার করতে গিয়ে তাঁকে শুধু স্বামীকে নয়, তাঁর দেশ ও সমাজকেও বুঝতে হয়েছিল। সেই সময়ের জেমিমার জীবন ছিল দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর গল্প।

জেমিমা গোল্ডস্মিথ ও ইমরান খান
আরও পড়ুন: England vs Pakistan: সচিনকে পেরিয়ে রুট, পাকিস্তানকে ৩-০-তে ধুয়ে দিল ইংল্যান্ড
তাঁদের সংসারে এল দুই ছেলে—সুলেমান ও কাসিম। কিন্তু যে সম্পর্ককে ঘিরে এত আলোড়ন, সেটি শেষ পর্যন্ত টিকল না। ২০০৪ সালে বিচ্ছেদ হয়ে গেল ইমরান ও জেমিমার। জেমিমা ফিরে এলেন লন্ডনে। ধীরে ধীরে নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করলেন। প্রযোজনা, লেখালেখি ও চিত্রনাট্যের কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেন। ইমরানের স্ত্রী হিসেবে যে পরিচয় তাঁকে একসময় বিশ্বের সামনে এনে দিয়েছিল, তার বাইরে নিজের জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরি করলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর আসনে ইমরান
ইমরানের জীবন অবশ্য তখনও থামেনি। বিয়ের মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যে পাকিস্তান তেহেরিক ই ইনসাফ নামের রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন, তার হাত ধরেই ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি। যে মানুষ একদিন হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে পাকিস্তানকে আনন্দে ভাসিয়েছিলেন, তিনিই কয়েক দশক পরে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে। ক্রিকেটার ইমরানের সঙ্গে রাজনীতিক ইমরানের দূরত্ব ছিল অনেক, কিন্তু একটা জিনিস একই ছিল—তাঁকে ঘিরে মানুষের মোহ। তারমধ্যে অবশ্য দুইবার বিয়ে করেছেন ইমরান। প্রথমে ২০১৫ সালে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি সাংবাদিক রেহাম খানকে। সেই বিয়ে যদিও একবছরও টেকেনি। তারপর ২০১৮ সালে বুশরা বিবিকে। তবে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি জেমিমা।
তার পরের গল্পটা অনেক বেশি কঠিন। ক্ষমতা গেল। মামলা এল। ২০২৩ থেকে কারাবন্দি ইমরান। দুর্নীতির মামলায় সাজাও হয়েছে তাঁর। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে তাঁকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে আবার জেলে ফিরতে হয়েছে। তাঁর পরিবার তাঁর স্বাস্থ্য ও কারাবন্দি অবস্থার নানা দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

জেমিমা গোল্ডস্মিথ আর ইমরান খান: দুই পৃথিবী
এই জায়গাতেই এসে জেমিমার নতুন বিয়ের খবরটা যেন আরও অন্যরকম হয়ে ওঠে। একদিকে নতুন জীবন শুরু করছেন তিনি। অন্যদিকে, তাঁর একসময়ের স্বামী এখনও বন্দি। একজন নিজের জীবনের পরের অধ্যায়ে এগিয়ে গিয়েছেন, অন্যজন আটকে আছেন আদালত, মামলা আর কারাগারের দীর্ঘ ছায়ায়।

১৯৯৫-এর জেমিমা গোল্ডস্মিথ আর ইমরান খান—দু’জনেই তখন জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে। একজন লন্ডনের অভিজাত পরিবারের তরুণী, অন্যজন বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট তারকা। তাঁদের প্রেম, বিয়ে, পাকিস্তানে যাওয়া—সব মিলিয়ে সেই সময়ের গল্পটা ছিল যেন দুই ভিন্ন পৃথিবীর মিলন। তিন দশক পরে সেই গল্পের দু’টি চরিত্র দাঁড়িয়ে আছেন সম্পূর্ণ আলাদা প্রান্তে।
জেমিমার জীবনে আবার বিয়ের আলো জ্বলেছে। আর ইমরানের জীবনে এখন কারাগারের আলো-আঁধারি। সময়ের সবচেয়ে নির্মম দিক বোধহয় এটাই—যে মানুষটিকে একদিন জীবনের সঙ্গী ভেবে নতুন পৃথিবীতে পা রেখেছিলেন জেমিমা, আজ তাঁর সঙ্গে একই পৃথিবী ভাগ করে নেওয়ার বদলে দু’জনকে নিজেদের আলাদা জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।
