কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর মাহাত্ম্য কী? কীভাবে করতে হয় দেবীর আরাধনা?

জ্যোতিষাচার্য উৎপলকুমার দাস
বাংলায় শারদীয়া দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের শেষে পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো করা হয়। যদিও বেশিরভাগ ভারতীয় কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমবস্যা তিথিতে দেবীর পুজো করে থাকেন। যাকে বাংলায় বলা হয় অলক্ষ্মীর বিদায় এবং লক্ষ্মীর আবাহন। এই উৎসবকে দীপাবলিও বলা হয়।
পৌরাণিক মতে ধন ও সম্পদের দেবী হলেন লক্ষ্মী। ধনও সম্পদের আশায় ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করা হয়। নারী ও পুরুষ উভয়েই পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। এখন প্রশ্ন হল ‘কোজাগরী’ কথাটি ব্যবহার করা হয় কেন? কোজাগরীর অর্থ হল ‘ কে জেগে আছো?’। শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষার ‘কো জাগতি?’ থেকে। এর মর্মার্থ হল, যার ধন–সম্পদ নেই, সে ধনসম্পদ প্রাপ্তির আশায় রাত্রি জাগরণ করে লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা ব্রতী হয়। কথিত আছে কোজাগরী পূর্ণিমার দিন দেবী রাত্রে খোঁজ নেন কে জেগে আছে? পুরাণে বর্ণিত আছে, যে রাত জেগে অক্ষক্রীড়া করে অর্থাৎ পাশা খেলে, লক্ষ্মী তাকে ধন–সম্পদ প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে শ্লোকটি হল— ‘নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ কো জাগর্তীতি ভাষিণী।
তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ।’
আমাদের দেশে, বলা ভালো বাংলায় নানা ভাবে, নানা রূপে লক্ষ্মী দেবীর রূপ কল্পনা করে পুজোর আয়োজন করা হয়।
১। মূর্তি
২। আড়ি লক্ষ্মী —বেতের ছোট ঝুড়িতে ধান ভর্তি করে তার ওপর দুটি কাঠের লম্বা সিঁদুর কৌটো লাল চেলি দিয়ে মুড়ে দেবীর রূপ দেওয়া হয়।কলাগাছের বাকল গোল করে নারকেল কাঠি দিয়ে আটকানো হয়। তাতে সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা হয়। কাঠের আসনের ওপর লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আলপনা দিয়ে তার ওপর এই রকম ৯টি চোঙা রাখা হয়। এতে পঞ্চশস্য, স্বর্ণ, তাম্র, শুকনো নারকেল দিয়ে লাল চেলি মুড়ে রাখা হয়।
৩। সপ্ততরী— নবপত্রিকা বা কলার পাতার তৈরি নৌকা, যাকে বাণিজ্য নৌকা বলা হয় তাতে টাকা–পয়সা, চাল–ডাল, হরিতকি, কড়ি, হলুদ দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়।
৪।লক্ষ্মীর মুখ সম্বলিত পোড়া মাটির ঘট— ঘটের মধ্যে চাল ও জল ভরে সেটিকে লক্ষ্মীর মূর্তি কল্পনা করে পুজো হয়।
৫। সরায় পটচিত্র— সাধারণত ওপার বাংলার মানুষরা বেশিরভাগই সরার পটচিত্রে লক্ষ্মীর আরাধনা করেন। সরা নানা রকম হয়। যেমন, ঢাকার সরা, ফরিদপুরি সরা,শান্তিপুরি সরা ইত্যাদি। অর্থাৎ স্থান বিশেষে ছবির পরিবর্তন হয়।
এবার আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করতে হবে। মা লক্ষ্মীর বাহন কেন পেচক? আসলে ধান হল লক্ষ্মীর প্রতীক। লক্ষ্মীর আবাহনে ধানের শীষ বা ধানের ছড়া অবশ্যই দেওয়া হয়। বাংলায় ধানের থেকে উৎপন্ন চালই প্রধান খাদ্যশস্য। তাই খাদ্যের অপচয় বা যে কোনও রকম অপচয় মা লক্ষ্মী সহ্য করতে পারেন না। যেখানে অপচয় সেখান থেকেই লক্ষ্মী পলায়ন করেন। এই জন্য বলা হয় লক্ষ্মী চঞ্চলা। ধানক্ষেতের আশেপাশে বা গ্রামে ধানের গোলার আশেপাশে প্রচুর ইঁদুর ঘুরে বেড়ায় এবং তারা শস্য নষ্ট করে। আর প্যাঁচার অন্যতম আহার হল ইঁদুর। অর্থাৎ প্যাঁচাকে বাহন হিসেবে রেখে মা লক্ষ্মী ফসলের অপচয় নিজেই রোধ করেন। এখানে আরেকটি বিষয়ে তথ্য দেওয়া উচিত। সেটি হল মা লক্ষ্মী কোনও রকম আওয়াজ পছন্দ করেন না। শঙ্খ ছাড়া অন্য কোনও কিছুই তাই লক্ষ্মীপুজোয় বাজানো নিষেধ। এমনকি ঘন্টা বাজানোও নিষিদ্ধ।
পুরাণে দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ ও তার সম্পদের উৎস বর্ণনা করা হয়েছে।
আদি লক্ষ্মী বা মহালক্ষ্মী: দেবীর আদিরূপ।
ধনলক্ষ্মী: অর্থ ও স্বর্ণদাত্রী রূপ।
ধান্য লক্ষ্মী: কৃষি সম্পদ প্রদানকারী রূপ।
গজলক্ষ্মী: গবাদি পশু ও হাতি সম্পদদাত্রী রূপ।
সন্তান লক্ষ্মী: সন্তান প্রদানকারী রূপ।
বীর লক্ষ্মী বা ধৈর্য লক্ষ্মী: যুদ্ধে বিরত্ব প্রদানকারী রূপ।
বিজয় লক্ষ্মী: জয় প্রদানকারী রূপ।
বিদ্যালক্ষ্মী: কলা, বিজ্ঞান ও বিদ্যা প্রদানকারী রূপ।
লক্ষ্মীপুজোর প্রধান প্রণাম মন্ত্রটি হল—
‘নমামি সর্বভূতানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।
যা গতিস্ত্বৎপ্রপন্নানাং সা মে ভূয়াৎ ত্বদর্চনাৎ।’
অর্থাৎ তুমি সকল প্রাণীকে বরদান করিয়া থাকো। তোমাকে প্রণাম করি। যাহারা তোমার স্মরণাগত হয় তাহাদের যে রূপ গতি হয়, তোমার পূজার ফলে আমারও যেন সেই গতি হয়।
মা লক্ষ্মীর প্রিয় ফুল হল করবী ফুল, গাঁদা ফুল, পদ্মফুল (বিভিন্ন রঙের পদ্মফুল) এবং বিভিন্ন রঙের জবা ফুল। যার মধ্যে নীল জবা সবচেয়ে প্রিয়।
লক্ষ্মী পুজোয় যেগুলি বর্জনীয় তা হল, লোহা বা স্টিলের বাসন। এছাড়া অন্য যে কোনও ধাতু চলতে পারে। লোহা দিয়ে অলক্ষ্মীর পুজো করা হয়। তাই লোহা দেখলে মা লক্ষ্মী রেগে যান। দেবীকে তুলসী পাতা প্রদান করবেন না। লক্ষ্মীর সঙ্গে সর্বদা নারায়ণ শিলার পুজো করতে হয়। লক্ষ্মী কখনও নারায়ণকে ছাড়া থাকেন না। তাই নারায়ণ শিলায় ফুল, তুলসীপত্র, চন্দন দিয়ে পুজো করতে হয়। তবেই লক্ষ্মীপুজো সম্পন্ন হয় এবং শুভফল প্রাপ্তি হয়।
