অনুগল্প: বিয়ের চিঠি

দীপারুণ ভট্টাচার্য
প্রতিবার এই সময় ত্রিশ বছরের পুরনো সেই দুর্গাপুজোর দিনে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। সে বছর ষষ্ঠীর সন্ধেবেলা শ্যামল সোহিনীকে প্রপোজ করেছিল। ভাবলে এখনও মনটা ভেতরে শিরশির করে। পরবর্তী চার বছরে কুলপি মালাইয়ের মতো জমে উঠেছিল তাদের প্রেম কাহিনি। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হতো এর বাইরে কোনও জগৎ নেই! কার কুদৃষ্টি যে তাদের সম্পর্কে পড়েছিল শ্যামল জানে না। একদিন কাচের চুড়ির মতো ভেঙে পড়েছিল সব বন্ধন। সেদিন ছিল বিজয়া। একা ঘরে নিজেকে বন্দি করেছিল শ্যামল। ভাবলে এখনও মনটা হু হু করে।
আজ একাদশী। ঢাক বাজিয়ে প্রতিমা চলে যাচ্ছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ পুরনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে গিয়েছিল তার। আর ঠিক তখনই এল পোস্টম্যান। সুন্দর নীল খামে একটা বিয়ের কার্ড। রীতিমতো চমকে উঠল শ্যামল। প্রায় ত্রিশ বছর আগে চুকে যাওয়া সম্পর্কের চিহ্ন আজও সে বহন করে চলেছে। বিয়ে করেনি। তার এই নিস্তরঙ্গ জীবনে কার্ডটা যেন বসন্তের তাজা বাতাস নিয়ে এসেছে! পুরনো পতাকার মতো সে পতপত করে উড়ছে এখন। বিষয়টা টেলিপ্যাথির থেকেও রোমাঞ্চকর। হুড়মুড় করে এখন কত কী মনে পড়ে যাচ্ছে। অনেক বছর পর সোহিনী যেন ফিরে এসেছে। মা কতবার বলেছে, ‘জীবনটা এইভাবে নষ্ট করিস না!’ মাকে বোঝানো যায়নি, অভ্যস্ত হয়ে গেলে জীবন বদলানো কঠিন।
নিজের বিয়ের কথাটা সোহিনী তাকে বলেছিল বিজয়ার সকালে। বলেছিল, ‘বাবার মতের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়।’ শ্যামল সেভাবে কিছুই বলতে পারেনি। কী বলবে! প্রবাসী পাত্রকে বিয়ে করে যে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর, তাকে কি কলকাতার ছেঁড়া স্বপ্নে বেঁধে রাখা যায়!
জীবনে প্রেম কি বারবার আসে? নিজেকে প্রশ্ন করে একটাই উত্তর পেয়েছিল সে, ‘না’। তাই সংসার হয়নি। সেই প্রেমিকার মেয়ের বিয়ে আজ অনেকগুলো প্রশ্ন তুলছে। সোহিনী ঠিকানা কোথায় পেল? সে আজও তার খোঁজ রাখে! তবে কি এখনও ভালোবাসা আছে!
প্রেমিকার মেয়ের বিয়েতে যাওয়াটা কি খুবই বেমানান! শ্যামল বুঝতে পারছে না। কার্ডে মেয়ের বাবার নাম নেই! তবে কি সোহিনী বিধবা হয়েছে! সেই জন্যই দেশে ফেরা! একাকীত্ব এই নিমন্ত্রণের মূলধন নয়তো! দূর থেকে আবার শোনা যাচ্ছে ঢাকের বাজনা। আরও একটা প্রতিমা আসছে। বিয়ের চিঠিটা হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নানান কিছু ভাবছে শ্যামল সেন। হঠাৎ পাশের বারান্দা থেকে সুনীল সেন বলল, ‘পোস্টম্যান তোমার লেটারবক্সে একটা বিয়ের কার্ড দিয়ে গেছে?’
নাম কাছাকাছি এবং পদবি এক হওয়ায় পোস্টম্যান মাঝে মাঝে ভুল করে। ভালো ভাবে দেখে শ্যামল চমকে উঠল! কার্ডটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘সোহিনী সরকার…’। তিনি শেষ করার আগেই সুনীল বাবু বললেন, ‘শ্যালিকা। দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর পর দেশে ফিরে অনেক কষ্টে মেয়েকে মানুষ করেছে।’
