ব্রিকস সম্মেলন: নতুন বিশ্বশক্তির সমীকরণে ভারত-রাশিয়া-চীন?
সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: দিল্লিতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। তার আগেই ভারতের মাটিতে এসে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এই সম্মেলনে যোগ দিতে হাজির। ফলে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতাই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন সমীকরণ নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর আগ্রহ।
সম্মেলনের আগে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন পুতিন। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, পরমাণু শক্তি, সার, উৎপাদন, রেল, ইস্পাত এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ—একাধিক ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় আলোচনায় রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তার প্রভাবও দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, শি জিনপিংয়ের ভারত সফরও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ফলে একই সময়ে মোদি-পুতিন এবং মোদি-জিনপিং বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—ভারত, রাশিয়া এবং চীন কি আগামী দিনের নতুন জোটশক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে?
উত্তরটা অবশ্যই সরল নয়। ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিরক্ষা থেকে জ্বালানি—বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের নির্ভরতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ৫১ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে।
চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। বাণিজ্যিক নির্ভরতা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সীমান্ত-সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা। তাই ভারত-রাশিয়া-চীনকে একটি সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে।
বরং ব্রিকসের ভিতর দিয়ে যে পরিবর্তনটি স্পষ্ট হচ্ছে, তা হল—বিশ্বের এককেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে আরও শক্তিশালী একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার দাবি।
ব্রিকস ইতিমধ্যেই তার পুরনো পাঁচ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ১১ সদস্যের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় নেতৃত্বে এবারের সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সরবরাহ-শৃঙ্খল, স্টার্টআপ, প্রযুক্তি এবং উন্নয়নমূলক সহযোগিতার মতো বিষয় সামনে রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্রিকস স্টার্টআপ ইনোভেশন ফান্ড এবং লজিস্টিকস-সাপ্লাই চেন সহযোগিতা কাঠামো সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষারই ইঙ্গিত।
এই ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে সংগঠনটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে এখানেই আর একটি বাস্তবতা রয়েছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির স্বার্থ এক নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে, রাশিয়া ও পশ্চিমের সংঘাতের প্রভাব রয়েছে, আবার প্রত্যেক সদস্যই নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তাই ব্রিকসকে এখনই ন্যাটোর মতো একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক বা সামরিক জোট বলা যাবে না।
তবু দিল্লির এবারের সম্মেলনের গুরুত্ব অন্য জায়গায়।একদিকে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বাধীন পুরনো আন্তর্জাতিক কাঠামো, অন্যদিকে এশিয়া, আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথের ক্রমবর্ধমান প্রভাব—এই দুইয়ের মাঝখানে ভারত নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও ভারত পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার দরজা বন্ধ করছে না। অর্থাৎ দিল্লির বার্তা স্পষ্ট—ভারত কারও শিবিরে নয়; ভারত নিজের স্বার্থ এবং বহু পক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে।
তাই প্রশ্নটি শুধু ভারত-রাশিয়া-চীনের জোট হবে কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন—বিশ্ব কি ধীরে ধীরে এমন এক নতুন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে একক কোনো শক্তি নয়, বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্র মিলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
দিল্লির ব্রিকস সম্মেলন সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার কেন্দ্রে এবার ভারত। তাই এবারের ব্রিকস সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই নতুন পথের সন্ধান মিলতে পারে। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অধীর আগ্রহে অথচ নীরবে তাকিয়ে আছেন এই সম্মেলনের দিকে।
