বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্র সরোবরে সাঁতার শিখতে গিয়ে মৃত্য়ু শিক্ষার্থীর ফারাক্কায় দ্রুত গতিতে চলছে লাইন মেরামতির কাজ মালদা মেডিকেলে শিশুমৃত্য়ুর জের, সাসপেন্ড সুপার এবার রাজ্য়ের মডেল স্কুল প্রকল্পে সিএম শ্রী ইন্সটিউট, ঘোষণা মুখ্য়মন্ত্রীর

Lionel Messi: যে পায়ে ফুটবল কবিতা হয়েছিল, আজ সেই পায়ে বিদায়ের ভার

01 September, 2026 1:07 AM Arko Banerjee
শেয়ার করুন

রোজারিও: রোজারিও থেকে বার্সেলোনা। বার্সেলোনা থেকে মারাকানা। মারাকানা থেকে কাতার। তারপর এক নীল-সাদা ১০ নম্বর জার্সির ছায়া ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীজুড়ে। লিওনেল মেসি শুধু ফুটবলার নন—একটি প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের দীর্ঘতম কবিতা। আজ সেই কবিতার শেষ পংক্তি লিখে কলম নামিয়ে রাখলেন তিনি। থেমে গেল একুশ বছরের এক মহাকাব্য।

কখনও কখনও একটা স্মৃতি বুকের ভিতর পুরনো জং ধরা দরজা এক ধাক্কায় খুলে দেয়। সেই খবর তো কেবল ২০৭ ম্যাচ বা ১২৫ গোলের ঠান্ডা পরিসংখ্যানের হিসাব নয়। কারণ মেসির আসল গল্প কোনো হিসেবি খাতায় ধরে না। কেউ তাঁকে প্রথম দেখেছিল উগ্র কিশোর বয়সে, কেউ চিনেছে বার্সেলোনার ১০ নম্বর হিসেবে, কেউ বা চিনেছে অসীম ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে। আবার সেই মানুষটাই কাতারের মায়াবী রাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন—কিংবদন্তিরাও কীভাবে একজীবনের সবটুকু দিয়ে অপেক্ষা করতে পারেন।

মেসির এই মহাকাব্য আজকের দিনে শুরু হয়নি। ফিরতে হয় ১৯৮৭ সালের ২৪ জুনের সেই ধুলোবালি মাখা রোদে। ইতালিয়ানো গারিবালদি ক্লিনিকে জন্মেছিলেন সেলিয়া ও হোর্হে মেসির তৃতীয় সন্তান—লিওনেল আন্দ্রেস। ফুটবল তখন শুধুই খেলা, কোনো পেশা বা ভবিষ্যৎ নয়। চার বছর বয়সে ঠাকুমা সেলিয়ার হাত ধরে আবান্দেরাদো গ্রানদোলির মাঠে যাওয়া। দল অসম্পূর্ণ। কোচ বললেন, “ছেলেটা যে বড্ড ছোট!” ঠাকুমা জেদ ধরলেন—”ওকে নামান।” ব্যস, বাকিটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভুলগুলোর একটি। সেদিন কেউ জানেনি, সেই ছোট্ট লিওর একটু জায়গা করে দিতে গিয়ে ফুটবল-ইতিহাস নিজের জন্য এক বিশাল সিংহাসন তৈরি করছে।

লিওনেল মেসি

তারপর শরীর এসে দাঁড়াল স্বপ্নের বিপরীতে। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। এক পুঁচকে শরীর, চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আমরা তো শেষের মেসিকে দেখি—তিনজনকে নাচিয়ে বের হয়ে যাওয়া, গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে তোলা। কিন্তু তার পেছনে ছিল এক ছোট শরীর আর এক দিগভ্রান্ত পরিবার। ১৩ বছর বয়সে আটলান্টিক পেরিয়ে স্পেনে যাওয়া সহজ ছিল না। স্বদেশ ছাড়ার সেই কান্না আর নিঃসঙ্গতা পেরিয়ে বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় ঢোকা। বয়সের সাথে সাথে তিনি শুধু বেড়ে ওঠেননি, যেন খেলার মাঠটাকেও নিজের মাপে ছোট করে এনেছিলেন। ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড ২০০৩-এ মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁকে পোর্তোর বিরুদ্ধে নামালেন। তারপর ২০০৪-এ সেই বিখ্যাত ৩০ নম্বর জার্সিতে অভিষেক।

লিওনেল মেসি

ক্যাম্প ন্যুতে বল পায়ে তাঁর দৌড়—সে তো এক অদ্ভুত কবিতা! দুলকি চালে অবলীলায় চারপাঁচজন প্রথম সারির ডিফেন্ডারকে টপকে কখন যে বিদ্যুতের গতিতে ঢুকে পড়তেন বিপক্ষের বক্সে। তারপর এক নয়নাভিরাম পায়ের ছোঁয়া দিয়ে বলে লিখে দিতেন গোলের ঠিকানা। সেসব আজ শুধুই শেষের কবিতা। অন্যেরা গতি বাড়াতেন, মেসি জানতেন কখন গতি থামিয়ে দিতে হয়। ফুটবল যে শুধু মাংসপেশির লড়াই নয়, তা পৃথিবী নতুন করে শিখল তাঁর বাঁ পায়ের জাদুতে। রোনালদিনহো, জাভি, ইনিয়েস্তা, গুয়ার্দিওলা—সব মিলে বার্সেলোনা একসময় দল থাকেনি, হয়ে উঠেছিল এক ফুটবল-দর্শন। যার মূল স্বর ছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: বিদায় মেসি: যে মানুষটি একটি দেশের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে হেঁটেছিলেন

তবু নিজ দেশে মেসি বহু বছর ছিলেন ‘অসম্পূর্ণ’। সেখানে মায়াবী ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে দিয়েগো মারাদোনা। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের যন্ত্রণা, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার পরাজয়, পেনাল্টি মিসের পর নিউ জার্সির ট্র্যাজিক রাতে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন—”আর নয়।” শ্রেষ্ঠত্ব যখন বোঝা হয়ে ওঠে, তখন এমনই হয়। কিন্তু ভালোবাসার নীল-সাদা শার্ট ছেড়ে কি পালানো যায়? তিনি ফিরে এলেন।

গুরু-শিষ্য

ফিরে এসে যেন মহাকাব্যের শেষ পর্বটা নতুন করে লিখলেন। ২০২১-এর মারাকানায় কোপা জয়, আর ২০২২-এর কাতারে সেই বিশ্বজয়! যে ছেলেটিকে একসময় ‘খুব ছোট’ বলে নামাতে চায়নি কেউ, তাঁর হাতে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মুকুট।

কান্নার রাত

কিংবদন্তিরা বিদায় নিলেও তাঁদের ছায়া থেকে যায়। মেসি থেকে যাবেন এক ন্যাপকিনে লেখা প্রথম চুক্তির মধ্যে, থেকে যাবেন ঠাকুমার জেদে, লা মাসিয়ার সবুজে আর কাতারের সোনালী ট্রফিতে। থেকে যাবেন সেইসব বাবার পাশে, যাঁরা সন্তানকে প্রথম ফুটবল কিনে দিয়ে বলেন—”মেসির মতো খেলবি?” বহু বছর পর, কোনো বাবা হয়তো ছেলেকে পুরনো এক ভিডিও দেখাবেন। ১০ নম্বর পরা এক বেঁটেখাটো মানুষ বাঁ পায়ের এক টানে তিনজন ডিফেন্ডারকে ছিটকে দিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে দিচ্ছেন বল। ছেলে হয়তো শুধোবে, “বাবা, এই লোকটা কে?” বাবা খানিক নীরব থেকে বলবেন—”ও? ও ফুটবলের জাদুকর। আমরা যখন বেঁচে ছিলাম, তখন ও খেলত।” ছেলে হয়তো বুঝবে না বাবার গলায় কেন এত বিষাদ। কিন্তু বাবা জানবেন—আসলে মেসি খেলতেন না, মেসির সাথে তাঁর নিজের ফেলে আসা শৈশব ও যৌবনের বসন্তটাও খেলত।

প্রতিবেদন

Arko Banerjee