সময়ও এখানে এগোয়–পিছোয়, জার্মানি বলে কথা!

শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায়
মিউনিখ
রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন, আপনার জীবনে হঠাৎ এক ঘণ্টা সময় বেড়ে গেছে, কেমন লাগবে? তাও আবার কোনও জাদু নয়, খোদ সরকারের নিয়ম মেনে! জার্মানিতে কিন্তু বছরে একদিন সত্যিই এমন কাণ্ড ঘটে। রাত তিনটে বাজতে না বাজতেই ঘড়ির কাঁটা আবার দুটোয় ফিরে যায়। অর্থাৎ দিব্যি এক ঘণ্টা বাড়তি ঘুমের সুযোগ! বাঙালি হিসেবে এমন সুযোগ হাতছাড়া করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
এই যেমন ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার। ভোররাতে জার্মানির ঘড়ি এক ঘণ্টা পিছিয়ে গেল। ব্যাপারটা আমার বেশ ভালোই লাগে। কোনও আবেদনপত্র নেই, কোনও খরচ নেই, অথচ এক ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম! তবে এই উপহার স্থায়ী নয়। মার্চ মাস এলেই সরকার যেন মনে করিয়ে দেয়, ‘গত অক্টোবরে যে ঘণ্টাটা পেয়েছিলে, এবার সেটা ফেরত দাও!’ তখন রাত দুটো থেকে সোজা তিনটে। মাঝখানের এক ঘণ্টা উধাও! মনে হয়, অক্টোবরের বাড়তি ঘুমটা মার্চে এসে সুদে–আসলে আদায় করে নেওয়া হল।
কলকাতায় জন্মেছি, বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, সময় আর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। কিন্তু ২০১৫ সালে কর্মসূত্রে মিউনিখে এসে দেখলাম, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। এখানে সময় শুধু অপেক্ষাই করে না, বছরে দু’বার সরকারি নিয়মে এগিয়েও যায়, পিছিয়েও আসে! সময়ানুবর্তিতার জন্য বিখ্যাত জার্মানরা নিজেরাই ঘড়ির কাঁটা নিয়ে এমন টানাটানি করেন, যেটা প্রথমদিকে বেশ অবাক করেছিল।
জার্মানিতে এই ব্যবস্থার নাম Zeitumstellung। মার্চের শেষ রবিবার রাত দুটো থেকে ঘড়ি সোজা তিনটেয় পৌঁছে যায়। শুরু হয় Sommerzeit বা গ্রীষ্মকালীন সময়। আর অক্টোবরের শেষ রবিবার রাত তিনটে পিছিয়ে দুটো হয়ে ফিরে আসে Winterzeit বা শীতকালীন সময়। অর্থাৎ একবার সময় ধার দেওয়া, আরেকবার ফেরত নেওয়া। জার্মানিতে সময়ের হিসাবেও যে এত নিয়মকানুন, সেটা এখানে না এলে বুঝতাম না!
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, কলকাতায় বাড়ির লোকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়। গ্রীষ্মকালে ভারত জার্মানির থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা এগিয়ে। মিউনিখে সন্ধে ছ’টা হলে কলকাতায় রাত সাড়ে ন’টা। কিন্তু শীতকালে সেই ব্যবধান সাড়ে চার ঘণ্টা। তখন একই সময়ে ফোন করলে ওপার থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, ‘এত রাতে ফোন করছিস কেন?’ অথচ আমার ঘড়িতে তো তখনও সবে সন্ধে! দোষটা আমার নয়, জার্মানির ঘড়ির।
আরেকটা মজার অভিজ্ঞতা হল কলকাতা থেকে মিউনিখ ফেরার বিমানের টিকিট কাটতে গিয়ে। একই সময়ে কলকাতা থেকে রওনা দিয়ে, যাত্রার সময়কাল একই হলেও গ্রীষ্মকালে মিউনিখের ঘড়িতে এক ঘণ্টা পরে পৌঁছোনোর সময় দেখাতে পারে, শীতকালে এক ঘণ্টা আগে। প্রথম প্রথম ভাবতাম, বিমানটা কি গ্রীষ্মকালে একটু ধীরেসুস্থে ওড়ে, নাকি শীতকালে আকাশে শর্টকাট মেরে আসে? পরে বুঝলাম, বিমানের গতির কোনও দোষ নেই, সবই ঘড়ির হিসেব! অবশ্য বাস্তবে বিমানের সময়সূচি ও যাত্রার সময়কালও ঋতুভেদে বদলাতে পারে। কিন্তু কলকাতা নিজের সময়ে দিব্যি স্থির, আর মিউনিখের ঘড়ি বছরে দু’বার এদিক–ওদিক। ব্যাপারটা আজও বেশ মজার লাগে।
তবে এই নিয়মের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৬ সালে জার্মানিতে দেশজুড়ে প্রথম গ্রীষ্মকালীন সময় চালু হয়। উদ্দেশ্য ছিল দিনের প্রাকৃতিক আলো বেশি কাজে লাগিয়ে জ্বালানি সাশ্রয় করা। পরে বিভিন্ন সময়ে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছে, আবার চালু হয়েছে। ১৯৮০ সালে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানিতে পুনরায় গ্রীষ্মকালীন সময় চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সময় পরিবর্তনের নিয়মে আরও সমন্বয় আনা হয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী মার্চের শেষ রবিবার ঘড়ি এগিয়ে এবং অক্টোবরের শেষ রবিবার পিছিয়ে দেওয়া হয়।
অবশ্য ঘড়ি এগোলেই সূর্য এক ঘণ্টা বেশি আলো দেয় না। শুধু দৈনন্দিন কাজের সময়টা বদলে যায়। মিউনিখে গ্রীষ্মকালে রাত ন’টা পেরিয়েও দিনের আলো থাকে। অফিস থেকে ফিরে হাঁটাহাঁটি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়। কিন্তু শীতকালে বিকেল চারটে–পাঁচটার মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসে। অফিস থেকে বেরিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, সারাদিন কাজ করলাম, সূর্যবাবুর সঙ্গে আজ আর দেখা হল না!

এই সময় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অবশ্য ইউরোপে বিতর্ক রয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধা আদৌ কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের ওপর এর প্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে মার্চে এক ঘণ্টা ঘুম হারানো অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর। আমি অবশ্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল ব্যাখ্যায় না গিয়ে সহজ কথায় বলি, ঘুমের এক ঘণ্টা কেড়ে নিলে কারই বা ভালো লাগে!
প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন আর কম্পিউটার নিজেরাই সময় বদলে নেয়। কিন্তু দেওয়াল ঘড়ি কিংবা রান্নাঘরের ঘড়ির দায়িত্ব এখনও আমাদের। ফলে বছরে দু’বার বাড়ির ঘড়িগুলোর মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়। মোবাইলে এক সময়, দেওয়ালে আরেক সময়! জার্মানির মতো সময়নিষ্ঠ দেশে দাঁড়িয়ে তখন নিজের ঘড়িকেই বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয়।
২০১৮ সালে ইউরোপীয় কমিশন এই নিয়ম বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। ২০১৯ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টও তাতে সমর্থন জানায়। কিন্তু স্থায়ীভাবে গ্রীষ্মকালীন সময় রাখা হবে, নাকি স্বাভাবিক সময়, তা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে এখনও চূড়ান্ত সমন্বিত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আপাতত ঘড়ির এই এগোনো–পিছোনো চলছেই। আগামী ২৮ মার্চ ২০২৭ আবার এক ঘণ্টা এগিয়ে যাবে সময়।
ভারতে অবশ্য সারা বছর একই সময় চলে। কলকাতায় গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, সব ঋতুতেই ঘড়ি নিজের জায়গায় থাকে। মিউনিখে এত বছর কাটিয়ে এখন অবশ্য এই নিয়মের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অক্টোবরের বাড়তি ঘুমটা বেশ উপভোগ করি। শুধু মার্চ মাসে সেই ঘণ্টা ফেরত দিতে একটু আপত্তি থাকে!
তবে জার্মানদের সময়ানুবর্তিতার প্রশংসা করতেই হয়। ঘড়ির কাঁটা বছরে দু’বার বদলালেও সময়ের হিসাব নিয়ে তাঁদের কোনও আপস নেই। ট্রেন সময়মতো চলবে কি না, সেটা অবশ্য আলাদা বিতর্ক!
কলকাতায় থাকতে শুনতাম, সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। মিউনিখে এসে দেখলাম, বছরে অন্তত একদিন এক ঘণ্টা সময় সত্যিই ফিরে আসে।
জার্মানি বলে কথা! এখানে সময়ও ধার দেওয়া হয়, আবার সময়মতো ফেরতও নেওয়া হয়!
